দরুদ শরীফের গুরুত্ব
========
আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনশরীফে বলেন-
ان الله وملائكته يصلون علىالنبى ياايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما-
ইরশাদ হচ্ছে: নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ ও সালাত প্রেরণ করেন! হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ কর।
দরূদশরীফের ফজিলত
========
হাদীস
عن انس بن مالك رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من صلى على صلت عليه الملئكة ومن صلت عليه الملئكة صلى الله عليه ومن صلى الله عليه لم يبق شئ فى السموات ولافى الارض الاصلى عليه-
বিশিষ্ট খাদেমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত আনাস বিন মালেক হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ছরকারেপাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর দরূদ পাঠ করবে, তার জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন।
আর যার জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন। তার উপর আল্লাহপাক রহমত বর্ষণ করেন এমনকি তার জন্য আসমান এবং জমিনের প্রতিটি বস্তুই দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করে।
হাদীস
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من صلى على صلاة واحدة امر الله حافظيه ان لا يكتبا عليه ذنبا ثلاثة ايام-
রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-যে ব্যক্তি আমার উপর মাত্র একবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার হেফাজতকারীদ্বয় (কেরামান কাতেবীন)-কে তার উপর তিনদিন পর্যন্ত কোন গুনাহ না লেখার নির্দেশ দেন।
হাদীস: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-
ان الجنة تشتاق الى خمسة نفرتالى القران وحافظ اللسان ومطعم الجيعان ومكسى العريات ومن صلى على حبيب الرحمن-
পাঁচ প্রকার মানুষের প্রতি স্বয়ং বেহেশতই আকৃষ্ট হয়ে আছে-
১. কোরআনশরীফ তিলাওয়াতকারী।
২. নিজের জিহ্বাকে অনর্থক কথাবার্তা থেকে রাকারী।
৩. ক্ষুধার্তকে অন্ন দানকারী।
৪. বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান।
৫. আল্লাহর প্রিয় বন্ধুর প্রতি দরূদ পাঠকারী। সুবহানাল্লাহ! দরূদ পাঠকারীর কত বড় মর্যাদা!
হাদীস- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি দিনের প্রথমভাগে আমার প্রতি দশবার দরূদ পাঠ করবে আর বিকালে দশবার পাঠ করবে কিয়ামতের দিন সে আমার শাফায়াত লাভ করবে।
হাদীস- হযরত রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, আল্লাহপাক প্রতিটি কথা থেকে এমন একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন- যার রয়েছে দুটি ডানা। একটি থাকবে পৃথিবীর পূর্বপ্রান্তে এবং অপরটি থাকবে পৃথিবীর পশ্চিমপ্রান্তে। তার মাথা এবং কাঁধ থাকবে আরশের নিচে। আর সে ফেরেশতা দরূদপাঠকারী বান্দার জন্য এই বলে দোয়া করে যে, হে আল্লাহ! তোমার বান্দার উপর রহম কর, যতণ সে তোমার নবীর উপর দরূদশরীফ পাঠ করতে থাকবে।
হাদীস- হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর শুক্রবার রাতে বা দিনে একশবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, আল্লাহপাক তার জীবনের গুনাহ হতে আশি বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।
হাদীস- ছরকারে কায়েনাত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি আমার উপর জুমার রাতে বা দিনে একশবার দরূদশরীফ পড়ে, আল্লাহপাক তার একশ অভাব পূরণ করে দেন এবং তার সাথে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। যখন ঐ ব্যক্তিকে (মৃত্যুর পর) কবরে দাফন করা হয়, তখন তাকে সে ফেরেশতা এমনিভাবে সুসংবাদ প্রদান করবে। যেমনিভাবে তোমাদের কেউ তোমাদের ভাইয়ের নিকট হাদিয়া সমেত প্রবেশ করে।
হাদীস- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর একহাজারবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে বেহেশতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়।
হাদীস
===
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمر برجل الى النار فاقول ردوه الى الميزان فاضع له شيئا كا لانملة معى فى ميزانه وهو الصلاة على فترجع ميزانه وينادى سعد فلان-
অর্থ: রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- ক্বিয়ামত দিবসে এক ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। তখন আমি বলব- তাকে মিজানের দিকে নিয়ে যাও। আমি মিজানের মধ্যে তার জন্য আমার আঙ্গুলের ন্যায় একটি জিনিস রাখব। তা হল আমার উপর পঠিত তার দরূদশরীফ। অতঃপর তার মিজানটি ভারি হয়ে যাবে এবং তার সম্পর্কে অদৃশ্য হতে বলা হবে অমুক ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে (অর্থাৎ যে ব্যক্তি দরূদশরীফ পাঠ করেছে সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে।
হাদীস- রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন- সে ব্যক্তিই আমার সবচেয়ে নিকটে যে আমার উপর অধিক হারে দরূদশরীফ পাঠ করে।
দালাইলুল খায়রাতের প্রণেতা মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান জাযিলি দরূদশরীফ এর ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে দালায়েলুল খায়রাত গ্রন্থকার আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান জাযিলি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেন।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- আল্লাহর প্রতিটি বান্দা আমার উপর দরূদশরীফ পাঠ করার সাথে সাথে দরূদশরীফটি অতি দ্রুতবেগে পূর্বপশ্চিম স্থল ও জলভাগে বের হয়ে পড়বে, এমন কোন জায়গা থাকবে না যেখানে দরূদশরীফ পৌঁছবে না এবং সাথে সাথে এ কথা বলে ভ্রমণ করবে যে- আমি হলাম অমুখের সন্তান অমুখের দরূদশরীফ। যা মোখতারে কুল সৃষ্টির শ্রেষ্ট সৃষ্টি হযরত সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরূদশরীফ পঠিত। অতঃপর সৃষ্টিজগতের সবাই প্রিয় নবীর উপর দরূদশরীফ পাঠ করবেন। আর আল্লাহ তায়ালা এ দরূদশরীফ হতে সত্তর ডানাবিশিষ্ট একটি পাখি সৃজন করবেন। আর সত্তরহাজারের প্রতিটি ডানায় থাকবে সত্তরহাজার পালক। আর সত্তরহাজারের প্রতি পালকে থাকবে সত্তরহাজার মাথা, প্রতিটি সত্তরহাজার মাথায় থাকবে সত্তরহাজার চেহারা। আর প্রতিটি সত্তরহাজার চেহারায় প্রতিটিতে থাকবে সত্তরহাজার মুখমণ্ডল। আর সত্তরহাজার মুখমণ্ডলের প্রতিটিতে থাকবে সত্তরহাজার জিহ্বা, আর প্রতিটি সত্তরহাজার জিহ্বা দ্বারা আল্লাহর তাসবীহ তথা প্রশংসা করতে থাকবে। ঐ প্রশংসার ছওয়াবসমূহ দরূদশরীফ পাঠকারীর আমলনামায় লিখা হবে।
পাঠক দেখুন যদি একবার দরূদশরীফ পাঠের অবস্থা এরকম হয় তাহলে হাজার হাজারবার দরূদশরীফ পাঠ করলে কত ছওয়াব পাওয়া যাবে।
শেখ জুরখ রাহমাতুল্লাহি আলাইহে লিখেছেন ‘দালাইলুল খায়রাত’ নামক কিতাব প্রণেতার কবরশরীফ থেকে মেশ্ক আম্বরের সুরভি বের হত। আর এর কারণ হল দরূদশরীফ পাঠ।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! দরূদশরীফ পাঠের ফযিলতের অসংখ্য হাদীসে করিমা রয়েছে। যত ইমাম ও আউলিয়া কেরামগণ কিতাব রচনা করেছেন প্রত্যেক কিতাবের মধ্যে দরূদশরীফের কিছু না কিছু আলোচনা করেছেন। দরূদশরীফের ফজিলতের অনেকগুলো শিনীয় ঘটনা রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করা হল-
এক ব্যবসায়ীর ঘটনা
========
নীল দরিয়ায় এক সওদাগরি জাহাজ যাচ্ছে নীল দরিয়ার মধ্যদিয়ে। এই জাহাজে এক আরোহী ছিল। সে নিয়মিত দরূদশরীফের আমল করত। অভ্যাসমাফিক একদিন সে দরূদশরীফ পড়ছিল। লক্ষ্য করল- জাহাজের একেবারে কুল ঘেঁষে একটি মাছ নীরবে এগিয়ে চলছে জাহজের সাথে এবং তার দরূদশরীফ পাঠ শোনছে। হঠাৎ করে মাছটির প্রতি নজর পড়ল একজন শিকারীর। শিকারী জাল ফেলল। ধরা পড়ল মাছটি। বিক্রির জন্য বাজারে ওঠালো।
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু অথবা হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ উদ্দেশেই বাজারে এসেছেন যে- যদি কোন বড় মাছ পাই তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত করব। বাজারে এসে পছন্দসই একটি বড়মাছ দেখে খরিদ করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। ভাগ্যক্রমে এটাই ছিল সেই মাছটি। বাড়িতে গিয়ে ভাল করে মাছ রান্না করতে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দাওয়াত করা হবে আজ এও জানিয়ে দিলেন জীবনসঙ্গিনীকে। জীবনসঙ্গিনী মাছ পরিষ্কার করে ধুয়ে যখন চুলায় দিলেন তখন শুরু হলো বিস্ময়কর সমস্যা। মাছ রান্না হওয়াতো দূরের কথা মাছের নিচে আগুনই জ্বলে না। বহু কষ্ট করে আগুন জ্বালিয়ে তার উপর মাছ দিতেই নিজে নিজেই নিভে যায় আগুন। অবশেষে বিস্ময়বিমূঢ় স্বামী-স্ত্রী নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে এনে পুর্ব ঘটনা বর্ণনা করলেন। সমস্ত ঘটনা শোনার পর হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন- দেখ এতো সাধারণ দুনিয়ার আগুনে। জাহান্নামের আগুন পর্যন্ত এই মাছকে জ্বালাতে পারবে না।
কারণ জিজ্ঞেসা করলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন- এক ব্যক্তি অত্যন্ত মনযোগ ও আন্তরিকতাসহ দরূদশরীফ পাঠ করছিল আর এই মাছটি তখন তর দরূদশরীফ শোনছিল। তাই তার জন্যে সকল আগুন হারাম হয়ে গেল। সুতরাং দরূদশরীফের ফজিলত বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়।
নিয়মিত যে জন দরূদ পাঠ করবে তার জন্যে দোযখের আগুন হারাম হয়ে যাবে।
এক আশেক যুবকের ঘটনা
========
বিখ্যাত তাপস হযরত শায়খ শিবলী (রহ.) বলেন- বায়তুল্লাহশরীফ যিয়ারতের সময় আমি একবার এক যুবকের সাক্ষাৎ পাই। সে বায়তুল্লাহশরীফ তাওয়াফ করছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ধারিত দোয়া না পড়ে সর্বত্রই সে শুধু দরূদশরীফ পাঠ করছিল।
শিবলি (রহ.) বলেন- তুমি কি দরূদশরীফ ছাড়া অন্য কোন দোয়া পার না।
তুমি সর্বত্রই এই দরূদ পড়ছো কেন? বলল আমি অনেক দোয়া মুখস্ত পারি। কিন্তু দরূদশরীফের যে উপকার আমি নিজে লাভ করেছি অন্য কোন দোয়ায় তা পাইনি। তাই সর্বত্র দরূদই পাঠ করছি।
শাইখ (রহ.) বললেন- ঘটনাটি কী আমাকে খুলে বল! অনেক বছর আগের কথা। আমি আমার বাবার সাথে হজ্বে আসছিলাম। বাগদাদে পৌছার পর আমার বাবা ভীষণভাবে জ্বরাক্রান্ত হলেন এবং কয়েকদিন পর মারা গেলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার মুখের আকৃতি পূর্ণ শূকরের মত হয়ে গেল। আমি এ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। তার মুখের উপর একটি কাপড় টেনে দিলাম। কাউকে এ অবস্থা বলতেও পারছিলাম না। আবার একা একা দাফন করতেও পারছিলাম না। প্রচণ্ড কষ্ট, চিন্তা ও দুর্ভাবনায় আমি উপুর হয়ে পড়েছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বলতেও পারব না। আমি ঘুমের মধ্যে দেখি কি অসাধারণ সুন্দর এক পবিত্র মানুষের আগমন। রূপময় সেই উজ্জ্বলকান্তি পবিত্র মানুষটি আমার বাবার কাছে এলেন। মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। আর অমনিই আমার বাবার চেহারা চাঁদের মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠল। তারপর তিনি যখন চলে যেতে উদ্যত হলেন, আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলাম। বড়ই বিপদে আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।
ইরশাদ করলেন তিনি- আমি পাপীদের আশ্রয়, অপরাধীদের সুপারিশকারী মুহাম্মদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
একথা শোনাতেই আমি পবিত্র কদম মোবারকে লুটিয়ে পড়লাম। কদমবুছি করলাম। তারপর আরয করলাম- হে রাসূল! আমার বাবার মৃত্যুসংবাদ আপনি কীভাবে পেলেন? আমিতো এ সংবাদ এখনো কাউকে দেইনি।
ইরশাদ করলেন- তোমার বাবা প্রতি রাতে আমার প্রতি তিনশবার দরূদশরীফ পাঠ করতো। আজ রাতে যখন তার দরূদ আমার কাছে পৌছায়নি তখন আমি সেই ফিরিশতাকে জিজ্ঞেস করলাম যে আমার কাছে তোমার বাবার দরূদশরীফ প্রতিদিন পৌছাত। তখন ফিরিশতা আমাকে বলল- সে তো আজ মারা গেছে এবং তার অবস্থা এই।
একথা শুনে আমার খুবই দুঃখ হলো। তাই চলে এলাম। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে গেলেন।
তারপর আমার ঘুম ভেঙে গেল। ফজর নামায পড়লাম। দেখলাম সত্যিই আমার বাবার চেহারা চাঁদের মত জ্বলজ্বল করছে। আরও দেখলাম লোক দলে দলে চারদিক থেকে ছুটে আসছে। যেন শহরে সব মানুষ ঢলে পড়েছে আমাদের দিকে। আমি ভেবে হয়রান হলাম। এদেরকে কে সংবাদ দিল! আমি অবশেষে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম- আপনারা আমার বাবার মৃত্যু এবং জানাযার সংবাদ কীভাবে পেলেন? তারা বলল- আমরা আকাশ থেকে একটি গায়েবি আওয়াজ শোনলাম- যে ব্যক্তি স্বীয় পাপ মাফ করতে চায় সে যেন অমুক মহল্লার অমুক স্থানে একজন লোক মারা গেছে তার জানাযায় গিয়ে শরিক হয়।
অতঃপর যুবক বলল- দরূদশরীফের মহান এই মর্ম ও মর্যাদা আমি নিজের চোখে প্রত্য করেছি। এ কারণেই আমি অন্যসব দোয়া ছেড়ে এখন সর্বদা দরূদশরীফই পাঠ করি। একথা শোনার পর শায়খ শিবলী (রহ.) বললেন, তুমি বাবার এই খুটিটি আরও শক্তভাবে ধর এবং কখনোও ছেড়ে দিও না। তাই ভক্তজনেরা সদা তাঁর প্রতি পড়ে সালাত ও সালাম।
খালি হাতে মহামূল্যবান মোতি
========
খায়রুল মাওয়ানিস গ্রন্থে একটি আজব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একবার আবু জেহেলসহ বেশ কিছু মুশরিকের একটি জটলায় এক ভিক্ষুক এসে হাত বাড়ালো। তখন বেঈমানরা মিলে তার সাথে এই বলে মসকরা করল- হেরেমশরীফের কাছে গিয়ে দেখ, ওখানে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বসে আছে তার কাছে গিয়ে চাও। তার কাছে অনেক কিছু আছে। তোমাকে সে প্রচুর দান করবে।
চেহারা অপরিচিত মুসাফির। ভালো মন্দ কিছুই জানা নেই। কথা মাফিক গেল হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে। গিয়ে হাত পাতল বিনয়ের সাথে। কিন্তু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে তখন দেয়ার মত কিছু নেই। তাই বলে না করলেন না। বরং ভিক্ষুককে বললেন তোমার হাতটি আমার সামনে খুলে ধর। সে খুলে ধরার পর হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছু একটা পড়ে তার হাতে ‘ফু’ দিয়ে বললেন,
বন্ধ করে নাও আর ওই কাফেরদের সামনে গিয়ে হাতটি খুলবে। তার আগে নয়।
কথামত ভিক্ষুকটি এদের সামনে যখন হাত খুলল সকলেই দেখল হাতের মধ্যে একটি মহামূল্যবান মোতি। যার মূল্য হাজার দিনারেরও বেশি। বেঈমানরা তাজ্জব হয়ে বলল- এই মোতিটি কি তোমাকে আলী দিয়েছে? বলল না, তিনি আমার হাতে এক ‘ফু’ দিয়েছেন। তার সেই ‘ফু’ এর বরকতেই এই মহারত্ন। ছুটে গেল পুরো দলটা আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খেদমতে। গিয়ে প্রশ্ন করল- এই মূল্যবান রত্ন আপনি কোথায় পেলেন? একথা সকলেই জানেন, সেটা ছিল খুবই নিদানকাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কারো কাছেই কোন বিশাল বিত্ত-সম্পদ ছিল না। তাই বিস্ময় ঘটারই কথা।
তাদের প্রশ্নের উত্তরে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন। ভিক্ষুকটি এসে খালি হতে ফিরিয়ে দিতে আমার লজ্জাবোধ হলো। আর দেয়ার মতো কিছু নেইও। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে দরূদ পড়ে তার হাতে ‘ফু’ দিয়ে দিলাম। দরূদশরীফের বরকতে আল্লাহ তায়ালা এই মহামূল্যবান রত্ন দান করেছেন। ঘটনায় উপস্থিত সবাই খুবই বিস্মিত হলো এবং সঙ্গে সঙ্গেই বে-দ্বীন ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল। (ঘটনাটি শাইখ আবু বকর সিন্দি (রহ.) বর্ণনা করেছেন)
স্বপ্নযোগে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জিয়ারত লাভ
========
মুসলমান মাত্রই স্বপ্নযোগে নবীয়েপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভ সৌভাগ্যবান হওয়ার বিপুল আগ্রহ ও অদম্য আকাক্সা থাকা একান্তই স্বাভাবিক। তাতে আছে আত্মার সঞ্জীবনী ইসলাম তথা আল্লাহর রাস্তায় অগ্রসর হবার একটি পুণ্যময় পদপে। হাজার চেষ্টার পরও এ প্রকার সৌভাগ্য অনেকের ভাগ্যে জোটে না। আর যাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিদারেপাক নসীব হবে তার ভাগ্য খুব ভাল। نافع الخلائك নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে- রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় আমাকে ঈমান সহকারে দেখল মূলত তার উপর দোযখের আগুন হারাম হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি আমাকে নিদ্রায় স্বপ্নে দেখল,
সে মূলত আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখল। কারণ বিতাড়িত শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন- যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে কিয়ামতের দিনে আমার সাক্ষাতলাভ করবে- যে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে আমার সাক্ষাতলাভ করবে আমি তার জন্য সুপারিশ করব। আর যার জন্য আমি সুপারিশ করব তাকে হাউজে কাওছার থেকে নিজ হাতে পানি পান করাবো। আর যাকে আমি হাউজে কাউছার থেকে পানি পান করাবো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জন্য দোযখের আগুন হারাম করে দেবেন। সুবহানাল্লাহ جواهر خمسه নামক কিতাবে জগৎখ্যাত আলেমে শরীয়ত ও তরীক্বত শেখ ছৈয়দ মুহাম্মদ গাউছ গাওয়ালীয়ারী রাহামতুল্লাহি আলাইহে বলেছেন- হযরত রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি স্বপ্নে আমর দীদার বা সাক্ষাৎ লাভ করবে, তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যাবে, আমাকে স্বপ্নে দেখা মূলত আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখারই নামান্তর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
من رأنى فى المنام فقد رأى الحق
যে ব্যক্তি আমাকে ঘুমের মধ্যে দেখবে সে বাস্তবই আমাকে দেখল।
নবীয়েপাক এর জিয়ারত লাভের উপায়
========
ইয়ামামার আমর ইবনে হাফ্ছকে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ তামীমী তার মৃত্যু শয্যায় থেকে নবীয়েপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন হাছিলের উদ্দেশ্যে নিম্নের নিয়মে নফল নামায পাঠ করে আমল করবার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ তামীমী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং তা শিখার রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি বাইতুল্লাহর নিকট এই প্রকার নামায আদায় করে নবীয়েপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভের আকাক্সা করার আমলের বিষয়টি হযরত খিজির আলাইহিস সালাম তাকে শিক্ষা দিয়েছেন।
নামাযের নিয়ম: মাগরিবের নামাযের বাদে এশার নামায পর্যন্ত দুই দুই রাকাত করে যত সম্ভব নফল নামায আদায় করবে। প্রত্যেক রাকাতে ৭বার সূরায়ে ইখলাছ আলহামদু বাদে পাঠ করবে।
ছালাম ফিরিয়ে ৭বার দরূদশরীফ ও ৭বার কালেমায়ে তামজীদ পাঠ করে নিজের উদ্দেশ্য সফলকল্পে দোয়া ও মুনাজাত করবে। দোয়াটি করার সময় নিম্নের দোয়াটি অবশ্যই পাঠ করতে হবে। দোয়াটি এই
يا حى يا قيوم يا ذالجلال والاكرام ياارحم الرحمين- يارحمن الدنيا والاخرة ورحيمهما يا اله الاولين والاخرين يا رب يارب يا رب يا الله يا الله يا الله-
বরকতযুক্ত এই দোয়াটি পাঠ করে চুপচাপ কারো সাথে কোন প্রকার কথা না বলে ডান পাঁজরে পুত-পবিত্র বিছানায় শুয়ে পড়বে এবং নিদ্রা যাওয়ার পূর্বপর্যন্ত দরূদশরীফটি পাঠ করতে থাকবে। খোদার অসীম কৃপায় ইনশাআল্লাহ সে রাত্রেই, না হয় সত্ত্বর স্বপ্নযোগে নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম এর দর্শন লাভ করে আমলকারী ভাগ্যবান হতে পারবে।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা শেখ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিস দেহলভী রাহমাতুল্লাহে আলাইহি স্বরচিত কিতাবে লিখেছেন যে ব্যক্তি জুমারদিন রাত্রে দুরাকাত নফল নামাযে প্রতি রাকাতে এগারবার আয়াতুল কুরছি এবং এগারবার সূরা এখলাছশরীফ পাঠ করে নামায শেষে একশতবার নিম্নের দরূদশরীফটি পাঠ করবে ইনশাআল্লাহ তিন জুমা অতিবাহিত না হতেই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখার গৌরব অর্জন করবে। দরূদশরীফটি নিম্নরূপ-
اللهم صل على محمدن النبى الامى واله واصحابه وسلم-
যদি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন উম্মত একাকী নির্জনে বসে মদীনাশরীফের দিকে নিমগ্ন হয়ে-
الصلوة السلام عليك يا سيدى يا رسول الله
প্রত্যেকদিন পাঁচশতবার পাঠ করে, আল্লাহর অসীম রহমতে সে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবশ্যই স্বপ্নে দেখবে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎলাভের জন্য আরো একটি অন্যতম শর্ত হল প্রার্থীব্যক্তি কখনো শরীয়তের বরখেলাফ চলতে পারবে না। হারাম থেকে অনেক দূরে সরে থাকতে হবে। নিজের পরিবার পরিজন সবাইকে শরীয়তের গণ্ডির ভেতর বেঁধে রাখতে হবে। উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা থেকে দূরে থাকতে হবে। সদা-সর্বদা পুত-পবিত্র, মিষ্টভাষী, সদালাপী, সুন্নতে নববীর পাবন্দী ও শরীয়তের অনুসরণকারী হতে হবে। এতে ইনশাআল্লাহ অবশ্যই তার নেক আমল হাসিল হবে এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাতে ধন্য হবেন।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দুরুদশরীফ ও দিদার লাভের আলোচনা করা হল।
প্রত্যেক নবী প্রেমিকদের উচিৎ প্রত্যেকদিন রাত্রে ১০০ (একশত) বার এবং বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে শুক্রবার রাত্র ৪০০শত বার দুরুদ পাঠ করা। কেননা ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- যে ব্যক্তি রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর প্রত্যেকদিন একশতবার দরূদশরীফ পাঠ করে সে শহিদী দরজায় মৃত্যুবরণ করবে। (বাহারে শরীয়ত)
তাছাড়া দরূদশরীফের আর একটি বিশেষত্ব হল আল্লাহপাক দরূদশরীফ পাঠ করার সাথে সাথে বিনাশর্তে কবুল করেন। নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত, দোয়া ও দান খয়রাত কবুলের শর্ত আছে (পূর্বে তার কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে) কিন্তু দরূদশরীফ কবুলের জন্য কোন শর্ত নাই যদি রিয়া বা (লোক দেখানো) না হয়ে থাকে।
আল্লাহপাক যেন প্রত্যেক আশিকে রাসূলদেরকে দরূদশরীফের আমল করার এবং হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত ও দিদার লাভ করার তৌফিক দান করেন।
দরূদ শরীফের এক আশ্চর্য ক্ষমতা
========
দালায়েলুল খায়রাতশরীফ প্রণয়ণের কারণটি একেবারে দিবা লোকের মত স্পষ্ট। উক্ত কিতাবের গ্রন্থকার হযরত মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান জাযিলি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি একদিন ভ্রমণ করতে গিয়ে ‘ফাস’ নামক শহরে উপস্থিত হলেন।
সেখানে ভ্রমণে জোহরের সময় হল তিনি পানি পাচ্ছিলেন না। অনেকণ পানি তালাশ করার পর একটি কূপ দৃষ্টিগোচর হল কিন্তু পানি পাওয়ার জন্য কোন মধ্যম তথা বালতি বা অন্য কোন পাত্র পেলেন না। উক্ত কিতাবের গ্রন্থকার পানির আশায় ঐ কূপের চারপাশে অসহায়ভাবে প্রদণি করতে লাগলেন। কিন্তু এর কোন সমাধান না পেয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। এই ঘটনা একজায়গা হতে আট বা নয় বৎসরের এক বিদুষী বালিকা প্রত্য করছেন। অল্পণপর বালিকা লেখক হযরত মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বললেন যে- আপনার এই চিন্তার কারণ কী? অনুগ্রহ করে আমাকে কি বলবেন?
তদুত্তরে লেখক বললেন যে, আমি মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান জোহরের নামায আদায় করতে চাই। অথচ অজু করার পানি পাওয়ার কোন মাধ্যম বা লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। আপনার সম্ভব হলে সাহায্য করুন। উত্তরে বালিকা বললেন আপনি একজন জগৎখ্যাত ওলি। অথচ এ সামান্য কাজকেও সমাধান করতে পারছেন না। এ বলে বালিকাটি বাহিরে এসে কূপের মধ্যে থু থু নিপে করলেন। সাথে সাথে পানি জোরে ফুসলিয়ে উঠে। কূপের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফলে উপস্থিত সবাই অজু করে নামাজ আদায় করলেন। নামাজ থেকে অবসর হয়ে লেখক ঐ বালিকার ঘরে গিয়ে ডেকে জানতে চেয়ে বললেন যে, আপনার ঐ সত্ত্বার কসম যে সত্ত্বা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং ইসলামের সঠিক পথ প্রদর্শন করছেন। তোমাকে আল্লাহ, সমস্ত নবী-রাসূল ও বিশেষত আমার নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোহাই দিয়ে বলছি যে, কুপ থেকে পানি উঠানো এটা কীভাবে সম্ভব হল?
বালিকা বললেন জনাব আপনি যদি আমাকে এতবড় শপথের কথা না বলতেন তাহলে আমি অবশ্যই বলতাম না। ইহা মূলত বিশেষ একটি দরূদশরীফ পাঠ করার কারণে পেয়েছি। যে দরূদ শরীফখানা আমি সর্বদা পাঠ করে আসছি।
শেখ মুহাম্মদ সুলাইমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলছেন যে, আমি উক্ত বালিকা থেকে দরূদশরীফটি মুখস্ত করলাম এবং উহাকে মানুষের মধ্যে প্রচার করার অনুমতি নিলাম। অতঃপর দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করলাম যে,
আমি একটি দরূদশরীফ সংক্রান্ত কিতাব রচনা করব। তাই দালায়েলুল খায়রাত নামক কিতাবটি রচনা করলাম।
সুতরাং আমার প্রবল ধারণা হল যে, উক্ত দরূদশরীফটিসহ দালায়েলুল খায়রাত কিতাবটি লেখা হয়েছে এ গ্রন্থখানা পাঠ করলে পাঠক ঐ দরূদশরীফ পাঠের সৌভাগ্য অর্জন করবে এবং সে রকম ফজিলত পাবে।
বালিকার পঠিত দরূদশরীফের নাম ‘সালাতুলা বীর’ । দরূদশরীফটি এই-
اللهم صلى على سيدنا محمد وعلى ال سيدنا صلوة دائمة مقبولة تودى بها عنا حقه العظيم
দরূদশরীফ পাঠের আদব
========
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট অবদান হল তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরূদশরীফ পাঠ করার নির্দেশ তথা সুযোগ দেওয়া। তাই উক্ত দরূদশরীফসমূহকে আদব তথা শিষ্টাচারের মাধ্যমে পাঠ করতে হবে। সাধারণ বা গুরুত্বহীনভাবে দরূদশরীফ পাঠ করলে হবে না। আন্তরিকতা ছাড়া কোন ফল পাওয়া যাবে না। তাই প্রখ্যাত আশেকে রাসূল ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক প্রণীত দালায়েলুল খায়রাত গ্রন্থের সূচনা থেকে কিছু নিয়ম কানুন অনুবাদ করে সেগুলি পাঠক সমাজের উপকারের জন্য উপস্থাপন বাঞ্চনীয় মনে করি। আশা করি পাঠকরা লাভবান হবেন।
১. পাঠক মহলের জন্য প্রয়োজন হল নিজেকে আত্মার সর্বপ্রকার রুগ্ন থেকে পুত:পবিত্র রাখা। অর্থাৎ অহংকার, হিংসা বিদ্বেষ থেকে নিজকে মুক্ত রাখা। তারপর অজু করে পরিস্কার কাপড় পরিধান করে সুগন্ধি লাগিয়ে দরূদ পাঠ শুরু করবেন। কেননা অজুবিহীন দরূদ পাঠ করা শিষ্টাচার বিরোধী যদিও বা শরীয়তের মধ্যে জায়েজ।
২. জায়নামাজে কেবলামুখী হয়ে বসবে অন্তরকে অত্যন্ত নরম করে পড়বেন।
৩. নিজ অন্তরকে সমুদয় দুনিয়াবী কল্পনা থেকে মুক্ত ও পবিত্র রেখে একাগ্রচিত্তে তেলাওয়াত করতে হবে।
৪. লোক দেখানোর জন্য দরূদশরীফ পাঠ করা চলবে না।
৫. যেমনিভাবে মুখে দরূদশরীফ পাঠ করবে তেমনিভাবে অন্তরেও একাগ্রতা চাই। অন্যথায় দরূদ পাঠ করে কোন ফলোদয় হবে না।
৬. দরূদশরীফ পাঠকালীন সময়ে এই ধারণা পোষণ করতে হবে যে, আমার এই দুরুদশরীফ হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে ফিরিশতা কর্তৃক পৌছানো হচ্ছে বা তিনি তা শুনছেন।
৭. নিজ অন্তরকে ক্ষীণ করে রোদন উন্মুখ অন্তরে দরূদশরীফ পাঠ করতে হবে।
৮. অন্তরের সম্পর্কটা আল্লাহর সাথে হবে।
৯. দরূদশরীফ পাঠ করার সময় যেন কারো সাথে কথা না হয়।
১০. যে সমস্ত জায়গা অপবিত্র ও দুর্গন্ধময় সে সমস্ত জায়গায় দরূদশরীফ পাঠ করা অনুচিত।
১১. হাসি ঠাট্টাকালে দরূদশরীফ পাঠ করা কুফুরীর আশঙ্কা বিদ্যমান।
১২. গুনাহের কাজের সময় দরূদশরীফ একেবারেই পড়া যাবে না।
১৩. যেখানে হাসি ও আনন্দ উল্লাস, তামাশা, নাচ-গান হয় সেখানে দরূদশরীফ পাঠ করা যাবে না।
আশা রাখি নবীপ্রেমিক আশেকগণ এ নিয়ম কানুন মেনে দরূদশরীফ পাঠে সচেতন হয়ে দরূদশরীফ পাঠ করবেন। (দালায়েলুল খায়রাত থেকে অনুদিত)
তিনস্থানে দরূদশরীফ পাঠ করা হারাম
========
১. ক্রেতাকে দেখিয়ে ব্যবসার মালের উৎকৃষ্টত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে।
২. কোন অনুষ্ঠানে কোন বড় লোক আগমনের সংবাদ দরূদশরীফের মাধ্যমে প্রদান করা বা আগমনের সংবাদদানের জন্য দরূদশরীফ পাঠ করা।
৩. ফরজ নামাযের তাশাহহুদে যখন হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম মোবারক আসে।
সাত স্থানে দরূদশরীফ পাঠ করা মাকরুহ
========
১. সহবাসের সময়।
২. পায়খানা প্রস্রাবে যাওয়ার সময়।
৩. ব্যবসার মাল বহুল প্রচারের উদ্দেশ্যে।
৪. তোষামোদের সময়।
৫. জবেহ করার সময়।
৬. হাঁচি দেওয়ার সময়।
৭. ফতোয়ায়ে ‘দুররে মুখতার’ এর মধ্যে উল্লেখ আছে যে, কোন ব্যক্তি ব্যবসা উদ্বোধনের সময় অথবা এমন কোন স্থানে যেখানে দরূদশরীফ পড়া উদ্দেশ্য নয় বরং দুনিয়াবী কোন উদ্দেশ্য থাকে, সে জায়গায় দরূদশরীফ পাঠ নিষেধ। দরূদশরীফের গুরুত্ব
========
আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনশরীফে বলেন-
ان الله وملائكته يصلون علىالنبى ياايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما-
ইরশাদ হচ্ছে: নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ ও সালাত প্রেরণ করেন! হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ কর।
দরূদশরীফের ফজিলত
========
হাদীস
عن انس بن مالك رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من صلى على صلت عليه الملئكة ومن صلت عليه الملئكة صلى الله عليه ومن صلى الله عليه لم يبق شئ فى السموات ولافى الارض الاصلى عليه-
বিশিষ্ট খাদেমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত আনাস বিন মালেক হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ছরকারেপাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর দরূদ পাঠ করবে, তার জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন।
আর যার জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন। তার উপর আল্লাহপাক রহমত বর্ষণ করেন এমনকি তার জন্য আসমান এবং জমিনের প্রতিটি বস্তুই দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করে।
হাদীস
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من صلى على صلاة واحدة امر الله حافظيه ان لا يكتبا عليه ذنبا ثلاثة ايام-
রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-যে ব্যক্তি আমার উপর মাত্র একবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার হেফাজতকারীদ্বয় (কেরামান কাতেবীন)-কে তার উপর তিনদিন পর্যন্ত কোন গুনাহ না লেখার নির্দেশ দেন।
হাদীস: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-
ان الجنة تشتاق الى خمسة نفرتالى القران وحافظ اللسان ومطعم الجيعان ومكسى العريات ومن صلى على حبيب الرحمن-
পাঁচ প্রকার মানুষের প্রতি স্বয়ং বেহেশতই আকৃষ্ট হয়ে আছে-
১. কোরআনশরীফ তিলাওয়াতকারী।
২. নিজের জিহ্বাকে অনর্থক কথাবার্তা থেকে রাকারী।
৩. ক্ষুধার্তকে অন্ন দানকারী।
৪. বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান।
৫. আল্লাহর প্রিয় বন্ধুর প্রতি দরূদ পাঠকারী। সুবহানাল্লাহ! দরূদ পাঠকারীর কত বড় মর্যাদা!
হাদীস- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি দিনের প্রথমভাগে আমার প্রতি দশবার দরূদ পাঠ করবে আর বিকালে দশবার পাঠ করবে কিয়ামতের দিন সে আমার শাফায়াত লাভ করবে।
হাদীস- হযরত রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, আল্লাহপাক প্রতিটি কথা থেকে এমন একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন- যার রয়েছে দুটি ডানা। একটি থাকবে পৃথিবীর পূর্বপ্রান্তে এবং অপরটি থাকবে পৃথিবীর পশ্চিমপ্রান্তে। তার মাথা এবং কাঁধ থাকবে আরশের নিচে। আর সে ফেরেশতা দরূদপাঠকারী বান্দার জন্য এই বলে দোয়া করে যে, হে আল্লাহ! তোমার বান্দার উপর রহম কর, যতণ সে তোমার নবীর উপর দরূদশরীফ পাঠ করতে থাকবে।
হাদীস- হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর শুক্রবার রাতে বা দিনে একশবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, আল্লাহপাক তার জীবনের গুনাহ হতে আশি বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।
হাদীস- ছরকারে কায়েনাত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি আমার উপর জুমার রাতে বা দিনে একশবার দরূদশরীফ পড়ে, আল্লাহপাক তার একশ অভাব পূরণ করে দেন এবং তার সাথে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। যখন ঐ ব্যক্তিকে (মৃত্যুর পর) কবরে দাফন করা হয়, তখন তাকে সে ফেরেশতা এমনিভাবে সুসংবাদ প্রদান করবে। যেমনিভাবে তোমাদের কেউ তোমাদের ভাইয়ের নিকট হাদিয়া সমেত প্রবেশ করে।
হাদীস- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি আমার উপর একহাজারবার দরূদশরীফ পাঠ করবে, তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে বেহেশতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়।
হাদীস
===
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمر برجل الى النار فاقول ردوه الى الميزان فاضع له شيئا كا لانملة معى فى ميزانه وهو الصلاة على فترجع ميزانه وينادى سعد فلان-
অর্থ: রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- ক্বিয়ামত দিবসে এক ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। তখন আমি বলব- তাকে মিজানের দিকে নিয়ে যাও। আমি মিজানের মধ্যে তার জন্য আমার আঙ্গুলের ন্যায় একটি জিনিস রাখব। তা হল আমার উপর পঠিত তার দরূদশরীফ। অতঃপর তার মিজানটি ভারি হয়ে যাবে এবং তার সম্পর্কে অদৃশ্য হতে বলা হবে অমুক ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে (অর্থাৎ যে ব্যক্তি দরূদশরীফ পাঠ করেছে সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে।
হাদীস- রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন- সে ব্যক্তিই আমার সবচেয়ে নিকটে যে আমার উপর অধিক হারে দরূদশরীফ পাঠ করে।
দালাইলুল খায়রাতের প্রণেতা মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান জাযিলি দরূদশরীফ এর ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে দালায়েলুল খায়রাত গ্রন্থকার আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান জাযিলি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেন।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- আল্লাহর প্রতিটি বান্দা আমার উপর দরূদশরীফ পাঠ করার সাথে সাথে দরূদশরীফটি অতি দ্রুতবেগে পূর্বপশ্চিম স্থল ও জলভাগে বের হয়ে পড়বে, এমন কোন জায়গা থাকবে না যেখানে দরূদশরীফ পৌঁছবে না এবং সাথে সাথে এ কথা বলে ভ্রমণ করবে যে- আমি হলাম অমুখের সন্তান অমুখের দরূদশরীফ। যা মোখতারে কুল সৃষ্টির শ্রেষ্ট সৃষ্টি হযরত সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরূদশরীফ পঠিত। অতঃপর সৃষ্টিজগতের সবাই প্রিয় নবীর উপর দরূদশরীফ পাঠ করবেন। আর আল্লাহ তায়ালা এ দরূদশরীফ হতে সত্তর ডানাবিশিষ্ট একটি পাখি সৃজন করবেন। আর সত্তরহাজারের প্রতিটি ডানায় থাকবে সত্তরহাজার পালক। আর সত্তরহাজারের প্রতি পালকে থাকবে সত্তরহাজার মাথা, প্রতিটি সত্তরহাজার মাথায় থাকবে সত্তরহাজার চেহারা। আর প্রতিটি সত্তরহাজার চেহারায় প্রতিটিতে থাকবে সত্তরহাজার মুখমণ্ডল। আর সত্তরহাজার মুখমণ্ডলের প্রতিটিতে থাকবে সত্তরহাজার জিহ্বা, আর প্রতিটি সত্তরহাজার জিহ্বা দ্বারা আল্লাহর তাসবীহ তথা প্রশংসা করতে থাকবে। ঐ প্রশংসার ছওয়াবসমূহ দরূদশরীফ পাঠকারীর আমলনামায় লিখা হবে।
পাঠক দেখুন যদি একবার দরূদশরীফ পাঠের অবস্থা এরকম হয় তাহলে হাজার হাজারবার দরূদশরীফ পাঠ করলে কত ছওয়াব পাওয়া যাবে।
শেখ জুরখ রাহমাতুল্লাহি আলাইহে লিখেছেন ‘দালাইলুল খায়রাত’ নামক কিতাব প্রণেতার কবরশরীফ থেকে মেশ্ক আম্বরের সুরভি বের হত। আর এর কারণ হল দরূদশরীফ পাঠ।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! দরূদশরীফ পাঠের ফযিলতের অসংখ্য হাদীসে করিমা রয়েছে। যত ইমাম ও আউলিয়া কেরামগণ কিতাব রচনা করেছেন প্রত্যেক কিতাবের মধ্যে দরূদশরীফের কিছু না কিছু আলোচনা করেছেন। দরূদশরীফের ফজিলতের অনেকগুলো শিনীয় ঘটনা রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করা হল-
এক ব্যবসায়ীর ঘটনা
========
নীল দরিয়ায় এক সওদাগরি জাহাজ যাচ্ছে নীল দরিয়ার মধ্যদিয়ে। এই জাহাজে এক আরোহী ছিল। সে নিয়মিত দরূদশরীফের আমল করত। অভ্যাসমাফিক একদিন সে দরূদশরীফ পড়ছিল। লক্ষ্য করল- জাহাজের একেবারে কুল ঘেঁষে একটি মাছ নীরবে এগিয়ে চলছে জাহজের সাথে এবং তার দরূদশরীফ পাঠ শোনছে। হঠাৎ করে মাছটির প্রতি নজর পড়ল একজন শিকারীর। শিকারী জাল ফেলল। ধরা পড়ল মাছটি। বিক্রির জন্য বাজারে ওঠালো।
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু অথবা হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ উদ্দেশেই বাজারে এসেছেন যে- যদি কোন বড় মাছ পাই তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত করব। বাজারে এসে পছন্দসই একটি বড়মাছ দেখে খরিদ করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। ভাগ্যক্রমে এটাই ছিল সেই মাছটি। বাড়িতে গিয়ে ভাল করে মাছ রান্না করতে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দাওয়াত করা হবে আজ এও জানিয়ে দিলেন জীবনসঙ্গিনীকে। জীবনসঙ্গিনী মাছ পরিষ্কার করে ধুয়ে যখন চুলায় দিলেন তখন শুরু হলো বিস্ময়কর সমস্যা। মাছ রান্না হওয়াতো দূরের কথা মাছের নিচে আগুনই জ্বলে না। বহু কষ্ট করে আগুন জ্বালিয়ে তার উপর মাছ দিতেই নিজে নিজেই নিভে যায় আগুন। অবশেষে বিস্ময়বিমূঢ় স্বামী-স্ত্রী নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে এনে পুর্ব ঘটনা বর্ণনা করলেন। সমস্ত ঘটনা শোনার পর হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন- দেখ এতো সাধারণ দুনিয়ার আগুনে। জাহান্নামের আগুন পর্যন্ত এই মাছকে জ্বালাতে পারবে না।
কারণ জিজ্ঞেসা করলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন- এক ব্যক্তি অত্যন্ত মনযোগ ও আন্তরিকতাসহ দরূদশরীফ পাঠ করছিল আর এই মাছটি তখন তর দরূদশরীফ শোনছিল। তাই তার জন্যে সকল আগুন হারাম হয়ে গেল। সুতরাং দরূদশরীফের ফজিলত বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়।
নিয়মিত যে জন দরূদ পাঠ করবে তার জন্যে দোযখের আগুন হারাম হয়ে যাবে।
এক আশেক যুবকের ঘটনা
========
বিখ্যাত তাপস হযরত শায়খ শিবলী (রহ.) বলেন- বায়তুল্লাহশরীফ যিয়ারতের সময় আমি একবার এক যুবকের সাক্ষাৎ পাই। সে বায়তুল্লাহশরীফ তাওয়াফ করছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ধারিত দোয়া না পড়ে সর্বত্রই সে শুধু দরূদশরীফ পাঠ করছিল।
শিবলি (রহ.) বলেন- তুমি কি দরূদশরীফ ছাড়া অন্য কোন দোয়া পার না।
তুমি সর্বত্রই এই দরূদ পড়ছো কেন? বলল আমি অনেক দোয়া মুখস্ত পারি। কিন্তু দরূদশরীফের যে উপকার আমি নিজে লাভ করেছি অন্য কোন দোয়ায় তা পাইনি। তাই সর্বত্র দরূদই পাঠ করছি।
শাইখ (রহ.) বললেন- ঘটনাটি কী আমাকে খুলে বল! অনেক বছর আগের কথা। আমি আমার বাবার সাথে হজ্বে আসছিলাম। বাগদাদে পৌছার পর আমার বাবা ভীষণভাবে জ্বরাক্রান্ত হলেন এবং কয়েকদিন পর মারা গেলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার মুখের আকৃতি পূর্ণ শূকরের মত হয়ে গেল। আমি এ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। তার মুখের উপর একটি কাপড় টেনে দিলাম। কাউকে এ অবস্থা বলতেও পারছিলাম না। আবার একা একা দাফন করতেও পারছিলাম না। প্রচণ্ড কষ্ট, চিন্তা ও দুর্ভাবনায় আমি উপুর হয়ে পড়েছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বলতেও পারব না। আমি ঘুমের মধ্যে দেখি কি অসাধারণ সুন্দর এক পবিত্র মানুষের আগমন। রূপময় সেই উজ্জ্বলকান্তি পবিত্র মানুষটি আমার বাবার কাছে এলেন। মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। আর অমনিই আমার বাবার চেহারা চাঁদের মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠল। তারপর তিনি যখন চলে যেতে উদ্যত হলেন, আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলাম। বড়ই বিপদে আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।
ইরশাদ করলেন তিনি- আমি পাপীদের আশ্রয়, অপরাধীদের সুপারিশকারী মুহাম্মদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
একথা শোনাতেই আমি পবিত্র কদম মোবারকে লুটিয়ে পড়লাম। কদমবুছি করলাম। তারপর আরয করলাম- হে রাসূল! আমার বাবার মৃত্যুসংবাদ আপনি কীভাবে পেলেন? আমিতো এ সংবাদ এখনো কাউকে দেইনি।
ইরশাদ করলেন- তোমার বাবা প্রতি রাতে আমার প্রতি তিনশবার দরূদশরীফ পাঠ করতো। আজ রাতে যখন তার দরূদ আমার কাছে পৌছায়নি তখন আমি সেই ফিরিশতাকে জিজ্ঞেস করলাম যে আমার কাছে তোমার বাবার দরূদশরীফ প্রতিদিন পৌছাত। তখন ফিরিশতা আমাকে বলল- সে তো আজ মারা গেছে এবং তার অবস্থা এই।
একথা শুনে আমার খুবই দুঃখ হলো। তাই চলে এলাম। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে গেলেন।
তারপর আমার ঘুম ভেঙে গেল। ফজর নামায পড়লাম। দেখলাম সত্যিই আমার বাবার চেহারা চাঁদের মত জ্বলজ্বল করছে। আরও দেখলাম লোক দলে দলে চারদিক থেকে ছুটে আসছে। যেন শহরে সব মানুষ ঢলে পড়েছে আমাদের দিকে। আমি ভেবে হয়রান হলাম। এদেরকে কে সংবাদ দিল! আমি অবশেষে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম- আপনারা আমার বাবার মৃত্যু এবং জানাযার সংবাদ কীভাবে পেলেন? তারা বলল- আমরা আকাশ থেকে একটি গায়েবি আওয়াজ শোনলাম- যে ব্যক্তি স্বীয় পাপ মাফ করতে চায় সে যেন অমুক মহল্লার অমুক স্থানে একজন লোক মারা গেছে তার জানাযায় গিয়ে শরিক হয়।
অতঃপর যুবক বলল- দরূদশরীফের মহান এই মর্ম ও মর্যাদা আমি নিজের চোখে প্রত্য করেছি। এ কারণেই আমি অন্যসব দোয়া ছেড়ে এখন সর্বদা দরূদশরীফই পাঠ করি। একথা শোনার পর শায়খ শিবলী (রহ.) বললেন, তুমি বাবার এই খুটিটি আরও শক্তভাবে ধর এবং কখনোও ছেড়ে দিও না। তাই ভক্তজনেরা সদা তাঁর প্রতি পড়ে সালাত ও সালাম।
খালি হাতে মহামূল্যবান মোতি
========
খায়রুল মাওয়ানিস গ্রন্থে একটি আজব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একবার আবু জেহেলসহ বেশ কিছু মুশরিকের একটি জটলায় এক ভিক্ষুক এসে হাত বাড়ালো। তখন বেঈমানরা মিলে তার সাথে এই বলে মসকরা করল- হেরেমশরীফের কাছে গিয়ে দেখ, ওখানে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বসে আছে তার কাছে গিয়ে চাও। তার কাছে অনেক কিছু আছে। তোমাকে সে প্রচুর দান করবে।
চেহারা অপরিচিত মুসাফির। ভালো মন্দ কিছুই জানা নেই। কথা মাফিক গেল হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে। গিয়ে হাত পাতল বিনয়ের সাথে। কিন্তু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে তখন দেয়ার মত কিছু নেই। তাই বলে না করলেন না। বরং ভিক্ষুককে বললেন তোমার হাতটি আমার সামনে খুলে ধর। সে খুলে ধরার পর হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছু একটা পড়ে তার হাতে ‘ফু’ দিয়ে বললেন,
বন্ধ করে নাও আর ওই কাফেরদের সামনে গিয়ে হাতটি খুলবে। তার আগে নয়।
কথামত ভিক্ষুকটি এদের সামনে যখন হাত খুলল সকলেই দেখল হাতের মধ্যে একটি মহামূল্যবান মোতি। যার মূল্য হাজার দিনারেরও বেশি। বেঈমানরা তাজ্জব হয়ে বলল- এই মোতিটি কি তোমাকে আলী দিয়েছে? বলল না, তিনি আমার হাতে এক ‘ফু’ দিয়েছেন। তার সেই ‘ফু’ এর বরকতেই এই মহারত্ন। ছুটে গেল পুরো দলটা আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খেদমতে। গিয়ে প্রশ্ন করল- এই মূল্যবান রত্ন আপনি কোথায় পেলেন? একথা সকলেই জানেন, সেটা ছিল খুবই নিদানকাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কারো কাছেই কোন বিশাল বিত্ত-সম্পদ ছিল না। তাই বিস্ময় ঘটারই কথা।
তাদের প্রশ্নের উত্তরে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন। ভিক্ষুকটি এসে খালি হতে ফিরিয়ে দিতে আমার লজ্জাবোধ হলো। আর দেয়ার মতো কিছু নেইও। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে দরূদ পড়ে তার হাতে ‘ফু’ দিয়ে দিলাম। দরূদশরীফের বরকতে আল্লাহ তায়ালা এই মহামূল্যবান রত্ন দান করেছেন। ঘটনায় উপস্থিত সবাই খুবই বিস্মিত হলো এবং সঙ্গে সঙ্গেই বে-দ্বীন ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল। (ঘটনাটি শাইখ আবু বকর সিন্দি (রহ.) বর্ণনা করেছেন)
স্বপ্নযোগে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জিয়ারত লাভ
========
মুসলমান মাত্রই স্বপ্নযোগে নবীয়েপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভ সৌভাগ্যবান হওয়ার বিপুল আগ্রহ ও অদম্য আকাক্সা থাকা একান্তই স্বাভাবিক। তাতে আছে আত্মার সঞ্জীবনী ইসলাম তথা আল্লাহর রাস্তায় অগ্রসর হবার একটি পুণ্যময় পদপে। হাজার চেষ্টার পরও এ প্রকার সৌভাগ্য অনেকের ভাগ্যে জোটে না। আর যাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিদারেপাক নসীব হবে তার ভাগ্য খুব ভাল। نافع الخلائك নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে- রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় আমাকে ঈমান সহকারে দেখল মূলত তার উপর দোযখের আগুন হারাম হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি আমাকে নিদ্রায় স্বপ্নে দেখল,
সে মূলত আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখল। কারণ বিতাড়িত শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন- যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে কিয়ামতের দিনে আমার সাক্ষাতলাভ করবে- যে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে আমার সাক্ষাতলাভ করবে আমি তার জন্য সুপারিশ করব। আর যার জন্য আমি সুপারিশ করব তাকে হাউজে কাওছার থেকে নিজ হাতে পানি পান করাবো। আর যাকে আমি হাউজে কাউছার থেকে পানি পান করাবো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জন্য দোযখের আগুন হারাম করে দেবেন। সুবহানাল্লাহ جواهر خمسه নামক কিতাবে জগৎখ্যাত আলেমে শরীয়ত ও তরীক্বত শেখ ছৈয়দ মুহাম্মদ গাউছ গাওয়ালীয়ারী রাহামতুল্লাহি আলাইহে বলেছেন- হযরত রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি স্বপ্নে আমর দীদার বা সাক্ষাৎ লাভ করবে, তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যাবে, আমাকে স্বপ্নে দেখা মূলত আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখারই নামান্তর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
من رأنى فى المنام فقد رأى الحق
যে ব্যক্তি আমাকে ঘুমের মধ্যে দেখবে সে বাস্তবই আমাকে দেখল।
নবীয়েপাক এর জিয়ারত লাভের উপায়
========
ইয়ামামার আমর ইবনে হাফ্ছকে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ তামীমী তার মৃত্যু শয্যায় থেকে নবীয়েপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন হাছিলের উদ্দেশ্যে নিম্নের নিয়মে নফল নামায পাঠ করে আমল করবার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ তামীমী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং তা শিখার রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি বাইতুল্লাহর নিকট এই প্রকার নামায আদায় করে নবীয়েপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দর্শন লাভের আকাক্সা করার আমলের বিষয়টি হযরত খিজির আলাইহিস সালাম তাকে শিক্ষা দিয়েছেন।
নামাযের নিয়ম: মাগরিবের নামাযের বাদে এশার নামায পর্যন্ত দুই দুই রাকাত করে যত সম্ভব নফল নামায আদায় করবে। প্রত্যেক রাকাতে ৭বার সূরায়ে ইখলাছ আলহামদু বাদে পাঠ করবে।
ছালাম ফিরিয়ে ৭বার দরূদশরীফ ও ৭বার কালেমায়ে তামজীদ পাঠ করে নিজের উদ্দেশ্য সফলকল্পে দোয়া ও মুনাজাত করবে। দোয়াটি করার সময় নিম্নের দোয়াটি অবশ্যই পাঠ করতে হবে। দোয়াটি এই
يا حى يا قيوم يا ذالجلال والاكرام ياارحم الرحمين- يارحمن الدنيا والاخرة ورحيمهما يا اله الاولين والاخرين يا رب يارب يا رب يا الله يا الله يا الله-
বরকতযুক্ত এই দোয়াটি পাঠ করে চুপচাপ কারো সাথে কোন প্রকার কথা না বলে ডান পাঁজরে পুত-পবিত্র বিছানায় শুয়ে পড়বে এবং নিদ্রা যাওয়ার পূর্বপর্যন্ত দরূদশরীফটি পাঠ করতে থাকবে। খোদার অসীম কৃপায় ইনশাআল্লাহ সে রাত্রেই, না হয় সত্ত্বর স্বপ্নযোগে নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম এর দর্শন লাভ করে আমলকারী ভাগ্যবান হতে পারবে।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা শেখ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিস দেহলভী রাহমাতুল্লাহে আলাইহি স্বরচিত কিতাবে লিখেছেন যে ব্যক্তি জুমারদিন রাত্রে দুরাকাত নফল নামাযে প্রতি রাকাতে এগারবার আয়াতুল কুরছি এবং এগারবার সূরা এখলাছশরীফ পাঠ করে নামায শেষে একশতবার নিম্নের দরূদশরীফটি পাঠ করবে ইনশাআল্লাহ তিন জুমা অতিবাহিত না হতেই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখার গৌরব অর্জন করবে। দরূদশরীফটি নিম্নরূপ-
اللهم صل على محمدن النبى الامى واله واصحابه وسلم-
যদি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন উম্মত একাকী নির্জনে বসে মদীনাশরীফের দিকে নিমগ্ন হয়ে-
الصلوة السلام عليك يا سيدى يا رسول الله
প্রত্যেকদিন পাঁচশতবার পাঠ করে, আল্লাহর অসীম রহমতে সে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবশ্যই স্বপ্নে দেখবে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎলাভের জন্য আরো একটি অন্যতম শর্ত হল প্রার্থীব্যক্তি কখনো শরীয়তের বরখেলাফ চলতে পারবে না। হারাম থেকে অনেক দূরে সরে থাকতে হবে। নিজের পরিবার পরিজন সবাইকে শরীয়তের গণ্ডির ভেতর বেঁধে রাখতে হবে। উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা থেকে দূরে থাকতে হবে। সদা-সর্বদা পুত-পবিত্র, মিষ্টভাষী, সদালাপী, সুন্নতে নববীর পাবন্দী ও শরীয়তের অনুসরণকারী হতে হবে। এতে ইনশাআল্লাহ অবশ্যই তার নেক আমল হাসিল হবে এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাতে ধন্য হবেন।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দুরুদশরীফ ও দিদার লাভের আলোচনা করা হল।
প্রত্যেক নবী প্রেমিকদের উচিৎ প্রত্যেকদিন রাত্রে ১০০ (একশত) বার এবং বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে শুক্রবার রাত্র ৪০০শত বার দুরুদ পাঠ করা। কেননা ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- যে ব্যক্তি রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর প্রত্যেকদিন একশতবার দরূদশরীফ পাঠ করে সে শহিদী দরজায় মৃত্যুবরণ করবে। (বাহারে শরীয়ত)
তাছাড়া দরূদশরীফের আর একটি বিশেষত্ব হল আল্লাহপাক দরূদশরীফ পাঠ করার সাথে সাথে বিনাশর্তে কবুল করেন। নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত, দোয়া ও দান খয়রাত কবুলের শর্ত আছে (পূর্বে তার কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে) কিন্তু দরূদশরীফ কবুলের জন্য কোন শর্ত নাই যদি রিয়া বা (লোক দেখানো) না হয়ে থাকে।
আল্লাহপাক যেন প্রত্যেক আশিকে রাসূলদেরকে দরূদশরীফের আমল করার এবং হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত ও দিদার লাভ করার তৌফিক দান করেন।
দরূদ শরীফের এক আশ্চর্য ক্ষমতা
========
দালায়েলুল খায়রাতশরীফ প্রণয়ণের কারণটি একেবারে দিবা লোকের মত স্পষ্ট। উক্ত কিতাবের গ্রন্থকার হযরত মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান জাযিলি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি একদিন ভ্রমণ করতে গিয়ে ‘ফাস’ নামক শহরে উপস্থিত হলেন।
সেখানে ভ্রমণে জোহরের সময় হল তিনি পানি পাচ্ছিলেন না। অনেকণ পানি তালাশ করার পর একটি কূপ দৃষ্টিগোচর হল কিন্তু পানি পাওয়ার জন্য কোন মধ্যম তথা বালতি বা অন্য কোন পাত্র পেলেন না। উক্ত কিতাবের গ্রন্থকার পানির আশায় ঐ কূপের চারপাশে অসহায়ভাবে প্রদণি করতে লাগলেন। কিন্তু এর কোন সমাধান না পেয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। এই ঘটনা একজায়গা হতে আট বা নয় বৎসরের এক বিদুষী বালিকা প্রত্য করছেন। অল্পণপর বালিকা লেখক হযরত মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বললেন যে- আপনার এই চিন্তার কারণ কী? অনুগ্রহ করে আমাকে কি বলবেন?
তদুত্তরে লেখক বললেন যে, আমি মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান জোহরের নামায আদায় করতে চাই। অথচ অজু করার পানি পাওয়ার কোন মাধ্যম বা লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। আপনার সম্ভব হলে সাহায্য করুন। উত্তরে বালিকা বললেন আপনি একজন জগৎখ্যাত ওলি। অথচ এ সামান্য কাজকেও সমাধান করতে পারছেন না। এ বলে বালিকাটি বাহিরে এসে কূপের মধ্যে থু থু নিপে করলেন। সাথে সাথে পানি জোরে ফুসলিয়ে উঠে। কূপের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফলে উপস্থিত সবাই অজু করে নামাজ আদায় করলেন। নামাজ থেকে অবসর হয়ে লেখক ঐ বালিকার ঘরে গিয়ে ডেকে জানতে চেয়ে বললেন যে, আপনার ঐ সত্ত্বার কসম যে সত্ত্বা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং ইসলামের সঠিক পথ প্রদর্শন করছেন। তোমাকে আল্লাহ, সমস্ত নবী-রাসূল ও বিশেষত আমার নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোহাই দিয়ে বলছি যে, কুপ থেকে পানি উঠানো এটা কীভাবে সম্ভব হল?
বালিকা বললেন জনাব আপনি যদি আমাকে এতবড় শপথের কথা না বলতেন তাহলে আমি অবশ্যই বলতাম না। ইহা মূলত বিশেষ একটি দরূদশরীফ পাঠ করার কারণে পেয়েছি। যে দরূদ শরীফখানা আমি সর্বদা পাঠ করে আসছি।
শেখ মুহাম্মদ সুলাইমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলছেন যে, আমি উক্ত বালিকা থেকে দরূদশরীফটি মুখস্ত করলাম এবং উহাকে মানুষের মধ্যে প্রচার করার অনুমতি নিলাম। অতঃপর দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করলাম যে,
আমি একটি দরূদশরীফ সংক্রান্ত কিতাব রচনা করব। তাই দালায়েলুল খায়রাত নামক কিতাবটি রচনা করলাম।
সুতরাং আমার প্রবল ধারণা হল যে, উক্ত দরূদশরীফটিসহ দালায়েলুল খায়রাত কিতাবটি লেখা হয়েছে এ গ্রন্থখানা পাঠ করলে পাঠক ঐ দরূদশরীফ পাঠের সৌভাগ্য অর্জন করবে এবং সে রকম ফজিলত পাবে।
বালিকার পঠিত দরূদশরীফের নাম ‘সালাতুলা বীর’ । দরূদশরীফটি এই-
اللهم صلى على سيدنا محمد وعلى ال سيدنا صلوة دائمة مقبولة تودى بها عنا حقه العظيم
দরূদশরীফ পাঠের আদব
========
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট অবদান হল তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরূদশরীফ পাঠ করার নির্দেশ তথা সুযোগ দেওয়া। তাই উক্ত দরূদশরীফসমূহকে আদব তথা শিষ্টাচারের মাধ্যমে পাঠ করতে হবে। সাধারণ বা গুরুত্বহীনভাবে দরূদশরীফ পাঠ করলে হবে না। আন্তরিকতা ছাড়া কোন ফল পাওয়া যাবে না। তাই প্রখ্যাত আশেকে রাসূল ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সুলাইমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক প্রণীত দালায়েলুল খায়রাত গ্রন্থের সূচনা থেকে কিছু নিয়ম কানুন অনুবাদ করে সেগুলি পাঠক সমাজের উপকারের জন্য উপস্থাপন বাঞ্চনীয় মনে করি। আশা করি পাঠকরা লাভবান হবেন।
১. পাঠক মহলের জন্য প্রয়োজন হল নিজেকে আত্মার সর্বপ্রকার রুগ্ন থেকে পুত:পবিত্র রাখা। অর্থাৎ অহংকার, হিংসা বিদ্বেষ থেকে নিজকে মুক্ত রাখা। তারপর অজু করে পরিস্কার কাপড় পরিধান করে সুগন্ধি লাগিয়ে দরূদ পাঠ শুরু করবেন। কেননা অজুবিহীন দরূদ পাঠ করা শিষ্টাচার বিরোধী যদিও বা শরীয়তের মধ্যে জায়েজ।
সংগ্রহঃজিকিরে এলাহি কিতাব থেকে
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন